Main Menu

হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ : একজন ‘স্বৈরশাসক’ কিংবা ‘পল্লীবন্ধু’

হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত নাম। বিভিন্ন সময় কথার ভিন্ন প্রবাহে বর্তমান প্রজন্মের কাছে এরশাদ হয়েছেন হাসির খোরাক। এছাড়া স্বৈরশাসক হিসেবেও এরশাদ ইতিহাসে নিন্দিত এক নাম। বিতর্কিতভাবে ক্ষমতায় এসেছিলেন তিনি, তার শাসনামলে নূর হোসেন হত্যাকাণ্ডের জন্যও তাকে সংসদে ক্ষমা চাইতে হয়েছিল।

এতসব নিন্দিত কর্মকাণ্ডের ভীড়েও এরশাদের রয়েছে বর্ণাঢ্য এক রাজনৈতিক জীবন। এখনও বিভিন্ন অঞ্চলে এরশাদ জনপ্রিয় এক নাম। গ্রামের নিম্নশ্রেণীর মানুষদের পাশে দাঁড়িয়ে এই এরশাদই পেয়েছেন ‘পল্লীবন্ধু’ খেতাব। একদিকে এরশাদ ছিলেন স্বৈরশাসক অন্যদিকে তিনি হয়ে উঠেছিলেন গরীব-দুঃখীদের প্রিয় বন্ধু।

এরশাদ

রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের আলোচিত-সমালোচিত জীবনের খন্ডচিত্র: 

পল্লীবন্ধু এরশাদ:

‘৬৮ হাজার গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে’ এই একটি উক্তিই এরশাদকে দেশের খেটে খাওয়া মানুষদের পরম কাছের বন্ধু বানিয়েছিল। স্বৈরশাসক হিসেবে তিনি যেমন নিন্দিত হয়েছেন তেমন বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের মাধ্যমে হয়েছেন নন্দিত। অনেকে তাকে উন্নয়নের স্বপ্নদ্রষ্টা দাবি করেন। এছাড়া গ্রামের মানুষদের কাছ থেকে তিনি ‘পল্লীবন্ধু’ খেতাব পেয়েছিলেন। বৃটিশ আমলের সেই ঘুনে ধরা প্রশাসন ভেঙে দিয়ে তৈরি করেন উপজেলা পদ্ধতি।

এরশাদ

জনগণের নির্বাচিত প্রশাসন ব্যবস্থার প্রবর্তনও হয়েছিল তার হাত ধরে। বহু বছর ধরে চলে আসা আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আনেন তিনি। প্রশাসনকে বিকেন্দ্রীকরণ করা এরশাদের অন্যতম সাহসী পদক্ষেপ ছিল। এছাড়া তিনি  উন্নতি সাধন করেন দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার। বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা, পল্লী উন্নয়ন, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, ভূমি সংস্কার, টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কের হাজার হাজার প্রকল্প বাস্তবায়ন করে এরশাদ এখনও তৈরি করে রেখেছেন এক বিরাট সমর্থক গোষ্ঠী। এরশাদের শাসনামলেই ২১টি জেলা ভেঙ্গে ৬৪টি জেলা তৈরি করা হয়েছে। বৃটিশ আমলের সেই মহকুমাগুলো এখন পূর্ণাঙ্গ জেলা হিসেবে দেশবাসীর কাছে পরিচিত হয়েছে এরশাদের কারণেই।

স্বৈরশাসক এরশাদ:

মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের সবচেয়ে ক্রান্তিকালে পাকিস্তানে ছিলেন এরশাদ। যুদ্ধের পরপরই দেশে ফিরে আসেন তিনি। তবে অনেকটা নীরবেই কাটিয়ে দিচ্ছিলেন সময়। এরশাদের উত্থানের শুরুটা হয় জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর। ক্ষমতায় গিয়ে জিয়াউর রহমান এরশাদকে বানিয়ে দেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের চেয়ারম্যান, যদিও এরশাদ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি। জিয়াউর রহমানের মন জয় করে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নিতে এরশাদকে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। ‘৮১ সালে বিপথগামী সেনা সদস্যদের হাতে প্রাণ হারান তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এই হত্যার পেছনে এরশাদকে দায়ী করা হলেও তা প্রমাণিত হয়নি কখনও।

জিয়ার মৃত্যুর পর দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা শুরু হলে ক্ষমতায় আসেন বিচারপতি সাত্তার। তবে ‘৮২ সালে সাত্তারকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করেন এরশাদ। সামরিক আইন জারি করে রাষ্ট্রপতি ও সামরিক আইন প্রশাসক হন তিনি।

১৯৮৪ সালে ১৮ দফা ঘোষণা করে বাস্তবায়ন পরিষদ তৈরী করেন এরশাদ। এরপরই তৈরি করেন নিজের রাজনৈতিক দল ‘জনদল’। সেই ‘জনদল’ই পরবর্তীতে রূপ নেয় ‘জাতীয় পার্টি’তে।

১৯৮৬ সালে বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে জাতীয় পার্টি। সে নির্বাচনে বিরোধী দল হয় আওয়ামী লীগ।

এরশাদ

নির্বাচনকে পাতানো দাবি করে আন্দোলনে নামে আওয়ামীলীগ ও বিএনপিসহ দেশের প্রায় সকল রাজনৈতিক দল। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে অবরোধসহ নানা কর্মসূচী পালন করে দলগুলো। তারই অংশ হিসেবে ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক মিছিলে বুকে ও পিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লিখে অংশ নেন নূর হোসেন। মিছিলটি ঢাকা জিপিও’র সামনে জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি আসলে স্বৈরশাসকের মদদপুষ্ট পুলিশবাহিনীর গুলিতে নূর হোসেনসহ মোট তিনজন আন্দোলনকারী নিহত হন, এসময় বহু আন্দোলনকারী আহত হন। নিহত অপর দুই ব্যক্তি হলেন যুবলীগ নেতা নুরুল হুদা বাবুল এবং আমিনুল হুদা টিটু।

নূর হোসেনের মৃত্যুতে আন্দোলন আরও তীব্র হয়। ক্ষমতার নেশায় মত্ত এরশাদ এই আন্দোলনের মাঝেই সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে ১৯৮৮ সালে আবারও নির্বাচনের আয়োজন করেন। সে নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ছাড়া আর কোনো দল অংশগ্রহণ না করলে বিরোধী দল বানানো হয় আসম আব্দুর রবকে।

তবে নূর হোসেনকে হত্যা করে এরশাদ নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনেন। সারাদেশের সকল শ্রেণীর মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়লে ৯ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে ১৯৯০ সালে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন এরশাদ।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় এলে দুর্নীতির মামলায় জেলে যান এরশাদ। এরপর ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসে মহাজোট। সে নির্বাচনে আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের অংশ ছিল এরশাদের জাতীয় পার্টিও। ১৯৯৬ সালে সংসদে ইয়ে নূর হোসেনের হত্যার জন্য সংসদে ক্ষমাও চেয়েছিলেন সাবেক এই রাষ্ট্রপ্রধান।

এরপর মূলত আওয়ামী লীগের অংশ হয়ে বাকিটা সময় পার করে দেয় জাতীয় পার্টি।

ব্যক্তিগত জীবন: 

রাজনৈতিক জীবন ছাড়াও ব্যক্তিগত জীবনের কারণেও অনেকবার আলোচনায় এসেছেন সাবেক এই রাষ্ট্রপতি। বিভিন্ন সময়ে নারী কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পরিচিত হয়েছেন প্রেমিক পুরুষ হিসেবে। নিজেকে কখনও কখনও কবি হিসেবেও দাবি করেছেন তিনি। তার সাবেক স্ত্রী বিদিশা তো তাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রেমিকের স্বীকৃতি দিয়েছেন। প্রাক্তন ছাত্রলীগ ফাউন্ডেশনের সভাপতি নুরে-আলম সিদ্দিকী এরশাদ সম্পর্কে বলেন,‘ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রেমিকার সংখ্যা কত, তা হাতে গুণে শেষ করা অসম্ভব।’ এরশাদের বর্তমান স্ত্রী রওশন এরশাদ। অভিমানে বর্তমানে দুই জন আলাদা থাকলেও তাদের বিচ্ছেদ হয়নি কখনও।






News Room - Click for call