Main Menu

পুরনো খবর থেকে পদ্মা সেতুতে কাটা মাথার গুজব!

সারাদেশে পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পে মানুষের কাটা মাথা লাগবে বলে ইতোমধ্যেই গুজব ছড়িয়ে পড়েছে। ২০১৫ সালের প্রকাশিত এক খবর নতুন করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে এই গুজব রটানো হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এই গুজবকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ সারাদেশের বিভিন্ন জায়গায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে। এ গুজব প্রতিরোধে ও রটানকারীদের গ্রেফতারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কাজ করছে পুলিশের সাইবার গোয়েন্দারা।

পদ্মা সেতুর নির্মাণ নিয়ে ফেসবুকে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে এরইমধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাঁচ জনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। শুক্রবার (১২ জুলাই)  দুপুরে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের সিনিয়র সহকারী পরিচালক এএসপি মিজানুর রহমান ভূঁইয়া জানান, পদ্মা সেতু নির্মাণ নিয়ে গুজব ছড়ানোর দায়ে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বৃহস্পতিবার (১১ জুলাই) রাত পর্যন্ত পাঁচ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

এরমধ্যে শহীদুল ইসলাম (২৫) নামে এক তরুণকে নড়াইল থেকে র‌্যাব-৬, আরমান হোসাইনকে (২০) চট্টগ্রাম থেকে র‌্যাব-৭, ফারুককে (৫০) মৌলভিবাজার থেকে র‌্যাব-১১ এবং রাজবাড়ীর পাংশা থেকে পার্থ আল হাসান (১৬) নামে এক কিশোরকে গ্রেফতার করেন র‌্যাব-৮ এর সদস্যরা।

এদিকে ছেলে ধরা সন্দেহে রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে দুজনকে পিটিয়ে হত্যা করেছে এলাকাবাসী।

মোহাম্মাদপুরে এক নারীকে একই সন্দেহে বেধরক মারধর করা হয়। পরে পুলিশ গিয়ে তাকে উদ্ধার করে।

এছাড়া লক্ষ্মীপুর জেলার দালাল বাজারে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে পুলিশে দেয় জনতা। ঘটনার আগে ওই ব্যক্তি রায়পুর-লক্ষ্মীপুর সড়ক দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। ছেলে ধরা সন্দেহে মারধরের এরকম আরও খবর পাওয়া যাচ্ছে।

জানা যায়, ২০১৫ সালের প্রকাশিত এক খবর নতুন করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উস্কে দিয়ে এই গুজব ছড়ানো হচ্ছে। ওই বছরের ১ মার্চ নদীতে পশুর রক্ত ঢেলে পদ্মা সেতুর ভিত্তি স্থাপন কাজের উদ্বোধন করে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি। মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় মূল সেতুর পরীক্ষামূলক ভিত্তি স্থাপনের সময় নদীতে গরু ও খাসির রক্ত ঢালতে দেখা যায় চাইনিজ ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের। ভাসিয়ে দেওয়া হয় কয়েকটি মুরগিও। তাদের বিশ্বাস, বড় কাজের শুরুতে পশু উৎসর্গের মাধ্যমে স্রষ্টার সন্তুষ্টি লাভ করা যায়, এড়ানো যায় বড় দুর্ঘটনা। তখন গণমাধ্যমেও এনিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।

জানা যায়, একটি মহল সেই সময়ের রক্তের ছবি এখন ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিয়েছে। অসাধু ফেসবুক ব্যবহারকারীরা মূল তথ্য আড়াল করে পুরনো সেই ছবিকে মানুষের রক্তের ছবি বলে চালাতে থাকে।

পদ্মা সেতু প্রকল্প কর্তৃপক্ষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এ ধরনের প্রচারণাকে ‘কুচক্রী মহলের গুজব’ বলে দাবি জানিয়েছেন। এই গুজবের বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রচারের ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে মঙ্গলবার (৯ জুলাই) পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম সরকারের প্রধান তথ্য কর্মকর্তার কাছে লেখা চিঠিতে এ তথ্য জানান।

ওই চিঠিতে বলা হয়, পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজ পরিচালনায় মানুষের মাথা লাগবে বলে একটি কুচক্রী মহল বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে অপপ্রচার চালাচ্ছে, তা প্রকল্প কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, এটি একটি গুজব। এর কোনও সত্যতা নেই। এমন অপপ্রচার আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ধরনের গুজবে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য দেশবাসীকে অনুরোধ জানাচ্ছি।

প্রকল্প পরিচালক চিঠিতে আরও জানান, গত ৩০ জুন পর্যন্ত মূল সেতুর বাস্তব কাজের অগ্রগতি ৮১ শতাংশ, নদীশাসন কাজের অগ্রগতি ৫৯ শতাংশ। এ প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৭১ শতাংশ।

পুলিশের সূত্র বলছে, ২০১৬- ২০১৭ সালে এই চক্রটি চুপচাপ ছিল। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম এই গুজবের সূত্রপাত হয় । এরপর গত কয়েক মাস চুপচাপ থাকার এবছরের মার্চ মাস থেকে ফের শুরু হয় গুজব। বলা হয়, পদ্মা সেতু তৈরিতে মানুষের মাথা লাগবে।  একটি চক্র এ ধরনের মনগড়া বক্তব্য দিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিচ্ছে। পুলিশ সদর দফতর এই ব্যক্তিদের গ্রেফতারের চেষ্টা করছে।

পুলিশ সদর দফতর এ নিয়ে নাগরিকদের উদ্দেশে  বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘গুজবে বিভ্রান্ত হবেন না। পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা ও রক্ত লাগবে, এটা গুজব।’ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যারা এধরনের গুজব ছড়াচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও জানিয়েছে পুলিশ।

গত ১০ জুলাই বিকাল থেকে ফেসবুকে এ ধরনের প্রচারণার বিরুদ্ধে কাজ শুরু হয়েছে বলে জানিয়ে পুলিশ সদর দফতরের জনসংযোগ ও গণমাধ্যম শাখার এআইজি সোহেল রানা বলেন, ‘কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা ও রক্ত লাগবে বলে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করছে। এটি পুরোপুরি মিথ্যা ও গুজব।

তিনি এসব গুজবে কান না দেওয়ার জন্য দেশবাসীকে অনুরোধ জানিয়েছেন। পুলিশ সদর দফতর জানিয়েছে, পদ্মা সেতু দেশের সর্ববৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প। এ প্রকল্পের সঙ্গে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি জড়িত। একটি মহল এই উন্নয়ন ব্যাহত করতে এ ধরনের গুজব রটিয়ে দেশবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে, যা গুরুতর অপরাধ। অনেকে না বুঝেই এটি শেয়ার করে অপরাধের অংশীদার হচ্ছেন।

এছাড়া পুলিশ সদর দফতরের দাবি, কিছু মানুষ এ গুজবের বিষয়টিকে কাজে লাগিয়ে, যাদের সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত শত্রুতা আছে, তাদের নাম ও ছবি ব্যবহার করে, গুজব ছড়ানোর জন্য তাদেরকে দায়ী করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন।

এআইজি সোহেল রানা বলেছেন, যারা এবিষয়ে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর গুজব ছড়াচ্ছেন, তাদের খুঁজে বের করতে এবং আইনের আওতায় আনতে পুলিশের বেশ কয়েকটি বিশেষ সাইবার গোয়েন্দা দল অনুসন্ধান তৎপরতা শুরু করেছে। তিনি বলেন, ‘দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির লক্ষ্যে এমন গুজব ছড়ানো একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। তাই এধরনের গুজব না ছড়াতে এবং তাতে কান না দেওয়ার জন্য দেশবাসীকে অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ।’






News Room - Click for call