Main Menu

আমি কালো অসুন্দর মেয়ে কিন্তু যোগ্যতাপূর্ণ- আয়শা সিদ্দিকা আকাশী

ওর চেহারা কুৎস্রী বাজে, কুৎসিত ইত্যাদি ফেসবুকের একটি কমেন্ডসে লিখেছিলেন আমার এক সাংবাদিক সহকর্মী। আমি দেখে একটুও অবাক হয়নি। কারণ আমি এই শব্দগুলোর সাথে পরিচিত। কিন্তু আমার আরো কয়েকজন সহকর্মী বলেছিলেন আসুন আমরা এর প্রতিবাদ করি। আমি বলেছিলাম-বাদ দাও, এ কিছু না, চলার পথে কত কি শুনতে হয়।

তবে আমি ঐ সহকর্মীর লেখা দেখে মনে মনে হেসেছিলাম। কারণ এখন আর সেই যুগ নেই, শুধু মেয়েদেরই সুন্দর হতে হবে আর ছেলেরা সোনা হিরার আংটি, তা বাকা হলেও সমস্যা নেই। এই মানসিকতা বহু আগেই শেষ হয়েছে। কারণ যুগ পালটেছে। আমি কালো বলে কুৎস্রী আর আপনি খাটো মোটা, ভুড়িওয়ালা পুরুষ বলে কুৎস্রী নন, তা আমি মানতে রাজি না, একজন সচেতন নারী মানবে না।

একজন সংবাদকর্মী হলেও এই মন্তব্য, এই মানসিকতা, বদলান তবেই না যোগ্যতা সম্পূর্ণ পুরুষ হয়ে মানুষ হবেন।

কয়েক বছর আগে আমার কয়েকটি সংবাদের জন্য সেই সময়ের ডিসি খুব ক্ষিপ্ত হলেন। রেগে গিয়ে তার কয়েকজন অফিসের স্টাফের সামনে বললেন, ঐ মেয়েটা না, দেখতে অসুন্দর, মুখ ভর্তি দাগ, কালো ইত্যাদি ইত্যাদি।

শুনে আমি তো অবাক। একজন ডিসি এত উচ্চমানের শিক্ষিত একজন মানুষ, তিনিও চেহারায় পড়ে রইলেন। আরে একবার ভাবুন এই অসুন্দর মেয়েটির লেখার জন্য আজ আপনাকে ভাবতে হচ্ছে, হিসেব দিতে হচ্ছে। চেহারা না, তার যোগ্যতাকে দেখুন, তার কাজ, তার মেধা দেখুন।

যাক আরো কয়েক বছর পিছনে যাই, বিয়ের পরের ঘটনা। আমরা এক আত্মীয়, সে আমার নাম দিলো কালোজিরা। আমি দেখতে অসুন্দর, কালো, আমার হাত-পা সব অসুন্দর। এই মেয়ে এই বাড়ির বউ হলো কিভাবে ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমার ঐ আত্মীয় তার জন্ম কালো মা-বাবার ঘরে, নিজেও খুব ভরসা না, উজ্জ্বল শ্যামলা। অথচ আমি বউ বলে, আমি কালো বলে আমি অসুন্দর। এই হচ্ছে আমাদের সমাজ-সংসার।

আরো পিছনের ঘটনা। আমি তখন এসএসসি পাস করে কলেজে ভর্তি হয়েছি। ছোট বেলা থেকেই লেখালেখির নেশা ছিলো। তাই ঐ সময়ে প্রথম আলো বন্ধুসভায় যোগ দেই। একদিন বন্ধুসভার মিটিং এ আসার সময় রাস্তার কিছু ছেলে আমাকে দেখে বললো মা কালি, মা কালি যায়। তখন বয়স কম ছিলো। তাই সহজে মন খাবার হয়ে গেলো। মিটিংএ বসেও মন ভালো হচ্ছে না। টের পেয়ে বন্ধুসভার আরেক সদস্য বাবু দা বললেন, কি হয়েছে মন খাবার কেন। তাকে সব বললাম। সে হেসে বললেন আরে এতে মন খারাবের কিছু নেই। ওরা তো তোমাকে কত বড় করেছে, সম্মান করেছে, মা কালি বলেছে, তোমার তো খুশি হবার কথা। আমরা মা কালিকে পূজা করি, তিনি আমাদের মা, আমাদের দেবী।

সত্যিই তো এভাবে ভাবলেই তো কোন কষ্ট নেই। তাছাড়া রাস্তার দাড়িয়ে কোন ছেলে কি বললো তাতে মন খারাবেরও কিছু নেই। ঐ সময়ে এইগুলো না ভাবলেও এখন বুঝতে পারি।

আমি যখন পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ি, তখন একদিন আমি ও আমার ছোট খালা নানাবাড়ির সামনে রাস্তা দিয়ে হাটছিলাম। তখন এক প্রতিবেশি খালাকে বলেছিলেন পাচ লাখ টাকা জোগাড় করে রেখে দিয়েন, এই কালো মেয়েকে বিয়ে দিতে লাগবে। সেদিন আমার খালা প্রতিবাদ করেছিলেন। কিন্তু তখন আমি তেমন কিছুই বুঝিনি। শুধু বুঝতে পেরেছিলাম আমাকে কেউ কালো বলে গালি দিচ্ছে।

কিন্তু আজ এই কালো মেয়েটাই পরিবারের গর্ব, সমাজের গর্ব। সে তার যোগ্যতা দিয়ে অনেক কাজ করছেন। কারো কোন সমস্যা হলে এই কালো মেয়েটার কাছে ছুটে আসেন। শুধু পরিবার নয়, সমাজের অনেক নির্যাতিত অসহায় মেয়েরাও এই কালো মেয়েটার কাছে ছুটে আসেন। অনেক পরিবার এই কালো মেয়েটার কাছে এসে তাদের দু:খ ভাগ করেন। এই কালো মেয়েটাই আজ অনেক অসহায়-প্রতিবন্ধী-নির্যাতিতা মানুষের একটু আশ্রয়, একটু সহযোগিতার মাধ্যম।
তাই গায়ের রং নয়, যোগ্যতা দিয়ে নারীকে ভাবতে শিখুন।






News Room - Click for call